ঢাকা, সোমবার, ২১ অক্টোবর ২০১৯

বিনিয়োগ! নিরাপদ থাকুক বে-মেয়াদি মিউচ্যুয়াল ফান্ডে

প্রকাশ: ২০১৯-০৬-১৯ ২১:১৭:৫০ || আপডেট: ২০১৯-০৬-২০ ১৯:১৭:২৭

মিউচুয়াল ফান্ড বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে একটি ট্রাস্ট বা একটি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি হিসেবে কাজ করে। এই অর্থ তাঁরা বিভিন্নভাবে কিছু নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক লক্ষ্য পূরণের জন্য বিনিয়োগ করে।

অন্য ভাবে বলা যায়, মিউচুয়াল ফান্ড একটা ট্রাস্ট হিসেবে কাজ করে যেটা বিনিয়োগকারীদের সঞ্চয়ের সমন্বয় সাধন করে; সেই অর্থ পুনরায় বিনিয়োগ করে মুনাফা অর্জনের জন্য, তারপর মুনাফাকৃত অর্থ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বণ্টন করে। এর বদৌলতে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি একটা নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা তাঁদের সার্ভিস চার্জ হিসেবে ধার্য করে।

প্রত্যেক মিউচুয়াল ফান্ড সাধারণত একটা বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করে এবং বিনিয়োগকারীগণ একই উদ্দেশ্য সাধনে এই বিশেষ প্রকল্পে বিনিয়োগ করে থাকেন। প্রত্যেকটা প্রকল্প একজন ফান্ড ম্যানেজার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়,  যিনি আর্থিক বিশ্লেষকের সাহায্যে বাজার কর্মক্ষমতার ওপর নজর রাখেন এবং সে অনুসারে বিনিয়োগ করেন।

 

বে-মেয়াদি মিউচ্যুয়াল ফান্ড বা ওপেন এন্ড মিউচ্যুয়াল ফান্ড:

আমি আমার আগের লেখায় মিউচ্যুয়াল ফান্ড নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার চেষ্টা করেছি। তাই এই আলোচনার মধ্যে সেগুলো আর আনবো না। আমি এখানে শুধু ওপেন এন্ড মিউচ্যুয়াল ফান্ড নিয়ে আলোচনার চেষ্টা করবো। আমরা আগেই বলেছি, সময়ের ওপর ভিত্তি করে মিউচ্যুয়াল ফান্ডকে ২ ভাগ ভাগ করা হয়েছে। সেগুলো হলো- ওপেন এন্ড মিউচ্যুয়াল ফান্ড এবং ক্লোজ এন্ড মিউচ্যুয়াল ফান্ড।

ওপেন এন্ড বা বে-মেয়াদি মিউচ্যুয়াল ফান্ড বর্তমান বিশ্বে সার্বাধিক জনপ্রিয় মিউচ্যুয়াল ফান্ড। শুধু বাংলাদেশে এর ব্যতিক্রম। বাংলাদেশে ওপেন এন্ড মিউচ্যুয়াল ফান্ডের জনপ্রিয়তা না পাওয়ার মূল কারণ হলো- এই সম্পর্কে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে স্বচ্ছ কোনো ধারণা না থাকা। যদি স্পষ্ট করে বলা যায়, তা হলো বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আসলে কোনো ধারণা নেই ওপেন এন্ড মিউচ্যুয়াল ফান্ড নিয়ে।

ওপেন এন্ড মিউচ্যুয়াল ফান্ডের সুবিধা:

১। আপনি যখন ইচ্ছা তখন ওপেন এন্ড মিউচ্যুয়াল ফান্ড কিনতে পারবেন; আবার যখন ইচ্ছা তখন তা বিক্রি করতে পারবেন।

২। নেট অ্যাসেট ভেল্যুর ভিত্তিতে লেনদেন করার কারণে একজন বিনিয়োগকারী বিশাল ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পাবেন। যেমন: বাজার ওঠানামার কারণে ক্লোজ এন্ড মিউচ্যুয়াল ফান্ডে অনেক বিনিয়োগকারী মার্কেট ভেল্যুর ভিত্তিতে লেনদেন করায় অনেক বেশি লুজার হয়ে থাকেন। আবার মার্কেটে ক্লোজ এন্ড মিউচ্যুয়াল ফান্ড চাহিদা না থাকার কারণে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা ফেস ভেল্যুতে ইউনিট কিনে পরবর্তীতে সেকেন্ডারি মার্কেটে অর্ধেক দামে বিক্রি করতে বাধ্য হয়।

অন্য দিকে ওপেন এন্ড মিউচ্যুয়াল ফান্ড ফেস ভেল্যুতে নেওয়ার পরেও নেট অ্যাসেট ভেল্যুর ভিত্তিতে লেনদেন করার কারণে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা লাভবান হয়ে থাকেন। ওপেন এন্ড মিউচ্যুয়াল ফান্ড বিক্রি করে যে কেউ যেকোনো সময়ে যে কেও তার টাকা লিক্যুইড করতে পারেন। সেক্ষেত্রে এনএভি প্রাইসে সম্পদ ব্যবস্থাপক প্রতিষ্ঠান ইউনিট মূল্য ফেরত দিতে বাধ্য থাকে। ফলশ্রুতিতে যে কোনো সময়ে একজন বিনিয়োগকারী এই ওপেন এন্ড মিউচ্যুয়াল ফান্ড বিক্রি করে তার টাকা লিক্যুইড করতে পারেন। আর এই জন্য ওপেন এন্ড মিউচ্যুয়াল ফান্ডের বিপরীতে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গুলো কে ক্যাশ রিজার্ভ রাখতে হয়।

ওপেন এন্ড মিউচ্যুয়াল ফান্ডের বৈশিষ্ট্য:

১। এই ফান্ডে তহবিলের মেয়াদ নির্দিষ্ট থাকে না। ইউনিট সংখ্যারও কোন নির্দিষ্টতা থাকে না। ট্রাস্টি যতদিন চাইবে ততদিন এই ফান্ড চলমান থাকতে পারবে।

২। বে-মেয়াদি মিউচ্যুয়াল ফান্ড কোন স্টক এক্সচেঞ্জে লেনদেন হয় না। শুধুমাত্র সিলেক্টিভ ডিলারদের মাধ্যমে ক্রয় বিক্রয় হয়।

৩। প্রতি সপ্তাহে শেষ কার্যদিবসে ওপেন এন্ড মিউচ্যুয়াল ফান্ডের এনএ ভি প্রকাশ করা হয়। এই তথ্য অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির ওয়েবসাইটে অথবা পত্রিকাতে দেওয়া হয়; যাতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ওই স্কিমের প্রকৃত এনএভি জানতে পারে।

৪। যেহেতু বিনিয়োগকারীদের যেকোনো সময়ে টাকার প্রয়োজন হয়; তাই ওপেন এন্ড মিউচ্যুয়াল ফান্ডের সম্পদ ব্যবস্থাপক প্রতিষ্ঠানকে ক্যাশ রিজার্ভ রাখতে হয়।

৫। ওপেন এন্ড মিউচ্যুয়াল ফান্ড এনএভির ভিত্তিতে লেনদেন হয় বলে বিনিয়োগকারী ক্ষতির সম্মুখীন হয় না।

 

বে-মেয়াদি স্কিমের ইউনিটের মূল্য নিরুপণ:

বে-মেয়াদি স্কিমের ইউনিটের বিক্রয় মূল্য এবং মিউচ্যুয়াল ফান্ড কর্তৃক যে কোন সময় ইউনিটের পুন:ক্রয় মূল্য উক্ত স্কিম নিরুপন করতে পারবে।

(২) মিউচ্যুয়াল ফান্ডের স্কিমের ইউনিটের বিক্রয় মূল্য পুন:ক্রয় মূল্য স্টক এক্সচেঞ্জের দৈনিক লেনদেন খবর, ইউনিটের প্রত্যেকটি বিক্রয় কেন্দ্রে এবং সম্পদ ব্যবস্থাপকের ওয়েব-সাইটে ও একই সাথে প্রেস রিলিজ আকারে উক্ত তথ্য অন্তত একটি পুঁজিবাজার সম্পর্কীত সংবাদ পরিবেশনকারী জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশ করবে। যাতে সংশ্লিষ্ট সকল বিনিয়োগকারী এটি জানতে পারেন।

(৩) যে কোন স্কিমের ইউনিটের বিক্রয় মূল্য ও পুন:ক্রয় মূল্য নির্ধারণকালে মিউচ্যুয়াল ফান্ড ইহা নিশ্চিত করবে যেন এই ২টি মূল্যের মধ্যকার ব্যবধান বিক্রয় মূল্যের শতকরা ৫ ভাগের বেশি না হয়।

(৪) সম্পদ ব্যবস্থাপক কোন স্কিমের ইউনিট প্রতি পুন:ক্রয় মূল্য নির্ধারণে ইউনিট প্রতি নিট সম্পদ মূল্যের সর্ব্বেচ্চ ১৫% কম বা বেশি করিতে পারবে।

 

ওপেন এন্ড মিউচ্যুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের আগে যা দেখা উচিতঃ

মিউচ্যুয়াল ফান্ডের  কত শতাংশ বিনিয়োগ শেয়ারে বা  ইক্যুইটি রয়েছে?

মিউচ্যুয়াল ফান্ডের  কত শতাংশ বিনিয়োগ  ঋণপত্রে  রয়েছে?

মিউচ্যুয়াল ফান্ডের  কত শতাংশ বিনিয়োগ সরকারি সিকিউরিটিজে  রয়েছে?

মিউচ্যুয়াল ফান্ডের কত শতাংশ বিনিয়োগ অন্যান্য মিউচ্যুয়াল ফান্ডে রয়েছে (এক্ষেত্রে ঐ মিউচ্যুয়াল ফান্ডগুলোর পোর্টফোলিও চেক করুন এবং NAV দেখুন) আপনি যদি পোর্টফোলিও চেক করে সন্তুষ্ট হোন তাহলে invest করুন|

বাংলাদেশে বর্তমানে বে মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ড আছে ৪৫টি। নিচে তার তালিকা দেওয়া হলো-

Open-end Mutual  Fund

 

 

কিভাবে এই ফান্ডে বিনিয়োগ করবেন?

১। বিনিয়োগকারীকে ১টা বিও হিসাব খুলতে হবে। সেটা যেকোনো ব্রোকারেজ হাউজ বা মার্চেন্ট ব্যাংক হতে পারে।

২। তারপর বে-মেয়াদি মিউচ্যুয়াল ফান্ড নির্বাচন করতে হবে। নির্বাচনের ক্ষেত্রে অবশ্যই এনএভি এবং ফান্ড যারা পরিচালনা করছে অর্থাৎ সম্পদ ব্যবস্থাপক প্রতিষ্ঠান কে সেটা দেখতে হবে।

৩। তারপর সরাসরি সম্পদ ব্যবস্থাপক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক নির্ধারিত ডিলার  বা অথরাইজড সেলিং এজেন্ট (এএসএ) থেকে এই ইউনিট ক্রয় করতে হবে।  ডিলার বা এএসএ না থাকলে সরাসরি এএমসি থেকে এই ফান্ডের ইউনিট ক্রয় করা যেতে পারে।

৪। ঠিক একইভাবে বিক্রয়ের সময়ে সম্পদ ব্যবস্থাপক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক নির্ধারিত ডিলার  বা অথরাইজড সেলিং এজেন্ট (এএসএ) এর কাছে বিক্রি করা যাবে।

৫। সব কিছু নির্ধারিত হবে এনএভির ওপর ভিত্তি করে। বিনিয়োগকারী যে দিন লেনদেন করবেন সেই দিনের এনএভির ভিত্তিতে লেনদেন করতে পারবেন। আর এই লেনদেন অবশ্যই বিও হিসাবের মাধ্যমে হতে হবে।

 

ইউনিট ক্রয়ের ক্ষেত্রে:

* বিও হিসাব খুলতে হবে।

* সম্পদ ব্যবস্থাপক প্রতিষ্ঠান থেকে ইউনিট ক্রয়ের জন্য আবেদন ফরম পূরণ করতে হবে।

* মিউচ্যুয়াল ফান্ডের সম্পদ ব্যবস্থাপক প্রতিষ্ঠান এএমসি ক্যাশ বা চেক গ্রহণ করবে।

* এএমসি নির্দিষ্ট ইউনিট এর জন্য ক্যশ বা চেক গ্রহণ করে পোর্টফোলিওর বিও হিসাবে ইউনিট প্রদান করবে।

 

বিক্রয় বা সারেন্ডার করার ক্ষেত্রে:

* বিনিয়োগকারী  ইউনিট বিক্রয়ের জন্য এএমসিতে আবেদন করবে।

* সিডিবিএল এর ট্রান্সফার ফরম পূরণ করে তা ব্রোকারেজ হাউজে জমা করতে হবে। যেখানে ওই ব্যক্তির বিও হিসাব রয়েছে সেই ব্রোকারেজ হাউজে জমা দিতে হবে।

* এখন ব্রোকারেজ হাউজ ট্রান্সফার ফরমের ভিত্তিতে মিউচ্যুয়াল ফান্ডের ইউনিট ট্রান্সফার করে দিবে।

* এএমসির তাদের বিও হিসাবে মিউচ্যুয়াল ফান্ডের ইউনিট পাওয়ার পর গ্রাহককে টাকা ট্রান্সফার করবে।

নিম্নে চিত্র সহকারে তুলে ধরা হলো

 

 

লেখক:

মনজুরুল আলম- প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা

এনসিসি সিকিউরিটিজ অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস লিমিটেড