ঢাকা, বুধবার, ২৩ অক্টোবর ২০১৯

বিকল্প বিনিয়োগ বিধিতে ২ বছরের লক-ইন প্রস্তাব

প্রকাশ: ২০১৯-০৩-১৯ ০৮:৪৫:০০ || আপডেট: ২০১৯-০৩-১৯ ১৮:৩৫:৩৫

পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) বিকল্প বিনিয়োগ বিধিমালায় প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলো জনমত যাচাইয়ের জন্য প্রকাশ করেছে। ২০১৫ সালে জারি করা বিধিমালায় মোট ২২টি পরিবর্তন বা সংযোজন প্রস্তাব করা হয়েছে।

এর মধ্যে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ও প্রাইভেট ইকুইটি ফান্ডের জন্য বিনিয়োগযোগ্য কোম্পানির সংজ্ঞায় পরিবর্তন, বিকল্প বিনিয়োগ তহবিলে লগ্নির লক-ইনের মেয়াদ হ্রাস, যোগ্য বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বিকল্প বিনিয়োগ তহবিলের ইউনিট কেনাবেচার সুযোগ সৃষ্টি, তহবিল নিবন্ধনের ফি হ্রাস, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ বৈচিত্র্য রক্ষা, স্থানীয় মানদণ্ডের বদলে আন্তর্জাতিক হিসাব মানদণ্ড অনুসরণ, তহবিলের মেয়াদ কমানোর সুযোগ অন্যতম।

 

ফান্ডে বিনিয়োগের লক-ইন:

বিকল্প বিনিয়োগ তহবিলে সব ধরনের বিনিয়োগ ৩ বছরের জন্য লক-ইন ছিল। অর্থাৎ ৩ বছরের আগে তহবিল থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহার করা যেত না। সংশোধনীতে তা ২ বছরে নামিয়ে আনা হয়েছে।

বিকল্প বিনিয়োগ বিধিমালা- ডাউনলোড করুন এখান থেকে

কোথায় হবে বিনিয়োগ:

পরিচালন কার্যক্রম শুরুর প্রথম ৩ বছরের মধ্যে সম্ভাবনাময় স্টার্ট আপ কোম্পানিগুলোয় বিনিয়োগ করতে পারবে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ড। আগে এটি ছিল ২ বছর। অন্যদিকে প্রাইভেট ইকুইটি বিনিয়োগের জন্য কমপক্ষে ৩ বছর ব্যবসা করা প্রাইভেট কোম্পানি বেছে নিতে হবে। আগে এটিও ছিল ২ বছর।

 

প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী:

প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী (ইআই) হিসেবে কারা বিকল্প বিনিয়োগ তহবিলে বিনিয়োগ করতে পারবেন, সেখানেও কিছু পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে নিবন্ধন থাকলেই পেনশন, প্রভিডেন্ট, সুপারঅ্যানুয়েশন ফান্ড ও ট্রাস্ট ফান্ড বিকল্প বিনিয়োগের জন্য ইআই বিবেচিত হচ্ছে। সংশোধনীতে কমিশন অনুমোদিত পেনশন ফান্ড, সুপারঅ্যানুয়েশন ফান্ড ও গ্র্যাচুইটি ফান্ডকে বিনিয়োগের সুযোগ দেয়া হচ্ছে। নিবন্ধিত প্রভিডেন্ট ফান্ডকে এখন অবশ্যই স্বীকৃত হতে হবে। ট্রাস্ট ফান্ডের ক্ষেত্রে নিবন্ধনই যথেষ্ট। বিদেশী ফান্ড ও ব্যক্তির জন্য সুযোগ বহাল থাকছে। সরকার ও স্থানীয় সরকার গঠিত বা অনুমোদিত ফান্ডকেও বিকল্প বিনিয়োগের সুযোগ দেয়া হয়েছে। উচ্চসম্পদধারী নিবাসী-অনিবাসী বাংলাদেশী ব্যক্তির জন্য বিকল্প বিনিয়োগ তহবিলে অর্থলগ্নির সুযোগ বহাল রয়েছে। এর বাইরে অন্য সব ক্যাটাগরির ইআইদের আবশ্যক যোগ্যতা অপরিবর্তিত রয়েছে।

তহবিলের নিবন্ধন ফি:

বিকল্প বিনিয়োগ তহবিল গঠনের সময় নিবন্ধন ফি হিসেবে প্রারম্ভিক মূলধনের শূন্য দশমিক ১ শতাংশ ব্যাংক ড্রাফট বা পেমেন্ট অর্ডারের মাধ্যমে কমিশনে জমা দিতে হয়। সংশোধনীতে তা দশমিক শূন্য ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে।

 

তহবিল বিনিয়োগে শর্ত ও বিধিনিষেধ:

বিকল্প বিনিয়োগ তহবিল থেকে বিনিয়োগের শর্ত ও বিধিনিষেধ সম্পর্কে বলা রয়েছে, তহবিলের অন্তত ৭৫ শতাংশ অর্থ যোগ্য ক্যাটাগরির তালিকাবহির্ভূত কোম্পানিতে বিনিয়োগ করতে হবে। এ ধরনের বিনিয়োগ বিলম্বিত হলে অব্যবহূত অর্থ মানি মার্কেটে সর্বোচ্চ এক বছরের জন্য বিনিয়োগ করার সুযোগ রয়েছে। তহবিলের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ অর্থ তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজ, অন্য তহবিল ব্যবস্থাপকের অধীনে পরিচালিত বিকল্প বিনিয়োগ তহবিলের ইউনিট কিংবা মানি মার্কেটে বিনিয়োগ করা যাবে।

তবে মানি মার্কেটে স্বাভাবিক এ বিনিয়োগ তহবিলের ১০ শতাংশ ছাড়াবে না। এছাড়া কোনো তালিকাভুক্ত কোম্পানিতে বিনিয়োগ তহবিলের ৫ শতাংশ ছাড়াবে না। একক কোনো তালিকাবহির্ভূত যোগ্য পোর্টফোলিও কোম্পানিতে (ভেঞ্চার, প্রাইভেট ইকুইটি বা ইম্প্যাক্ট ইনভেস্টমেন্ট) বিনিয়োগ কোনোভাবেই তহবিলের ২৫ শতাংশ ছাড়াবে না। সর্বোপরি নিজ ক্ষেত্রের কোম্পানিগুলোয় বিকল্প বিনিয়োগ তহবিল থেকে শুধু মূলধনজাতীয় বিনিয়োগ করতে হবে, কোম্পানিগুলোকে ঋণ দেয়া বা তাদের ইস্যু করা ঋণধর্মী (বন্ড-ডিবেঞ্চার) সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করা যাবে না। এর সবই অপরিবর্তিত রয়েছে। নতুন করে আরোপ করা শর্ত হলো, পোর্টফোলিও কোম্পানিগুলোয় বিনিয়োগের সময় ঝুঁকির ভিত্তিতে বিনিয়োগে বৈচিত্র্য আনতে হবে তহবিল ব্যবস্থাপককে। এটি হতে হবে তাদের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার গৃহীত নীতির আলোকে।

 

তহবিলের মেয়াদ:

বিকল্প বিনিয়োগ তহবিল ৫ থেকে ১৫ বছর মেয়াদের জন্য গঠিত হবে। তহবিল গঠনকালেই এর ঘোষণা দিতে হয়। গঠনকালীন নথিপত্র সমর্থন করলে দুই-তৃতীয়াংশ ইউনিটের মালিকদের সম্মতি ও কমিশনের অনুমোদনের ভিত্তিতে এ মেয়াদ দুই বছর পর্যন্ত বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। মেয়াদ শেষ হওয়ার ছয় মাস আগে সাধারণ সভা করে ইউনিটহোল্ডারদের সম্মতি নিয়ে এজন্য কমিশনে আবেদন করতে হয়। একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করে মেয়াদ কমানোরও আবেদন করা যাবে।

 

তহবিলের তালিকাভুক্তি:

বর্তমানে বিকল্প বিনিয়োগ তহবিল স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হতে পারে না। সংশোধনীতে এক্সচেঞ্জের অল্টারনেটিভ ট্রেডিং বোর্ডে তালিকাভুক্তির সুযোগ রাখা হয়েছে। বিকল্প বিনিয়োগ তহবিল থেকে সর্বশেষ দফায় মূলধন গ্রহণের দুই বছরের মধ্যে কোনো পোর্টফোলিও কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির আবেদন করতে পারবে না—এ নিয়ম বহাল রয়েছে। বর্তমান বিধিমালায় ইআইদের মধ্যে ফান্ডের ইউনিট কেনাবেচার বিষয়ে কিছু বলা নেই। সংশোধনীতে এর সুযোগ প্রস্তাব করা হয়েছে।

 

ইনভেস্টমেন্ট গাইডলাইন ও অভ্যন্তরীণ অনুমোদন:

বিকল্প বিনিয়োগ তহবিল ব্যবস্থাপকের দায়িত্বের মধ্যে উপবিধি ১০-এ বলা হয়েছিল, ইনভেস্টমেন্ট গাইডলাইন অনুসারে সব বিনিয়োগ করতে হবে এবং তহবিল ছাড়ের আগে ইনভেস্টমেন্ট কমিটি ও ট্রাস্টির অনুমোদন নিতে হবে। সংশোধনীতে বলা হয়েছে, সব বিনিয়োগ ইনভেস্টমেন্ট গাইডলাইনের ভিত্তিতে হতে হবে এবং তাতে ইনভেস্টমেন্ট কমিটির অনুমোদন থাকতে হবে। তহবিল ছাড়ের পূর্বশর্ত হিসেবে ট্রাস্টির কাছ থেকে সম্মতি প্রয়োজন হবে তহবিল ব্যবস্থাপকের।

 

আন্তর্জাতিক হিসাব মানদণ্ড:

ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি) এরই মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে হিসাব ও নিরীক্ষার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড আত্মস্থ করেছে। তাই বিকল্প বিনিয়োগ তহবিলের সব হিসাব ও নিরীক্ষায় পূর্ববর্তী স্থানীয় মানদণ্ডের বদলে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণের কথা বলা হয়েছে বিধিমালার সংশোধনীতে।

মূল্যায়ন পদ্ধতি:

ভ্যালুয়েশনের মেথডোলজি দাঁড় করানোর জন্য আগে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ও প্রাইভেট ইকুইটি ভ্যালুয়েশনের হালনাগাদ আন্তর্জাতিক গাইডলাইন অনুসরণের কথা বলা হয়েছিল, যাতে ট্রাস্টির অনুমোদন আবশ্যক। তহবিল গঠনকালীন নথিপত্র ও ফান্ডের বার্ষিক প্রতিবেদনেও তা উল্লেখ করার বাধ্যবাধকতা ছিল। সংশোধনীতে মেথডোলজি প্রস্তুতে হিসাবের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড আইএএস, আইএফআরএস এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে গৃহীত ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ও প্রাইভেট ইকুইটি ভ্যালুয়েশনের হালনাগাদ গাইডলাইন অনুসরণের কথা বলা হয়েছে। এখানেও ট্রাস্টির অনুমোদন ও যথা ডিসক্লোজার আবশ্যক।

 

ডিসক্লোজার:

আগে সম্পদ ব্যবস্থাপককে ইআইদের অনুকূলে শুধু ফান্ডের গঠনকালীন নথিপত্র দেয়ার কথা বলা হলেও বর্তমানে এর সঙ্গে ফান্ডের আর্থিক প্রতিবেদন যোগ করা হয়েছে। এছাড়া ফান্ডে উদ্যোক্তা ও তহবিল ব্যবস্থাপকের বিনিয়োগ সম্পর্কে সে বিনিয়োগ করার সময়ই ট্রাস্টিকে এবং সংশ্লিষ্ট বার্ষিক প্রতিবেদনে বিনিয়োগকারীদের অবহিত করার বিধান রয়েছে। এখন তহবিল ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিনিয়োগও একই ডিসক্লোজারের আওতায় আনা হচ্ছে।

 

কমপ্লায়েন্স বোর্ড গঠন:

বর্তমানে শরিয়াহসম্মত বিকল্প বিনিয়োগ নিশ্চিত করার দায়িত্ব শরিয়াহ কাউন্সিলের ওপর ন্যস্ত। সংশোধনীতে শরিয়াহ কাউন্সিলের পাশাপাশি সম্পদ ব্যবস্থাপককে শরিয়াহ বোর্ডের পরামর্শ ও অনুমোদন গ্রহণেরও সুযোগ দেয়া হয়েছে।

 

সম্পদ ব্যবস্থাপকের ফি:

বর্তমানে বিনিয়োগের রিটার্ন হিসেবে পূর্বনির্ধারিত হার্ডল রেট অর্জন করতে পারলে তহবিল ব্যবস্থাপকের জন্য বার্ষিক মুনাফার ২০ শতাংশ পারফরম্যান্স ফি হিসেবে নেয়ার সুযোগ রয়েছে। সংশোধনীতে বলা হয়েছে, এজন্য ফান্ডের রিটার্ন হার্ডল রেটকে ছাড়িয়ে যেতে হবে।